বিচারের দাবিও অবিচারের উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে
· Prothom Alo

সম্প্রতি পল্লবীর শিশুধর্ষণ ও হত্যা এবং এর আগে মাগুরায় একই ধরনের নৃশংস ঘটনার পর জনমনে ক্ষোভের তীব্র বিস্ফোরণ দেখা গেছে। এই ক্ষোভের তাৎক্ষণিক
প্রতিক্রিয়া কেবল ফাঁসির দাবিতেই আটকে ছিল না; বরং দ্রুত ও প্রকাশ্যে শাস্তি বাস্তবায়নের দাবিও উঠেছিল। পল্লবীর ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে বিচারিক রায় হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কিছু বিশেষ প্রবণতা নিয়ে আমাদের বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন।
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার যেখানে মাত্র ৩ শতাংশ, সেখানে বিচারহীনতাই যে এই ক্ষোভের মূল উৎস, তা স্পষ্টত বোঝা যায়। বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রমাণ, সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে বিচারহীনতার এক দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। (প্রথম আলো, ২ মে ২০২৬)
Visit moryak.biz for more information.
যখন বছরের পর বছর ধরে অপরাধীরা কাঠামোগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবে পার পেয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে বিচারব্যবস্থার ওপর চরম অনাস্থা তৈরি হয়। এই অনাস্থা কখনো প্রকাশিত হয় তীব্র ‘শাস্তি’ চাওয়ার মধ্য দিয়ে, আবার কখনো তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বাসনায় রূপ নেয়। সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এই যে ‘প্রকাশ্যে’ শাস্তি বাস্তবায়নের দাবি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বাড়িতে হামলার ঘটনা, তা আদতে বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতারই এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া।
কিন্তু সম্প্রতি এই গণক্ষোভকে পুঁজি করে সমাজের সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এমন সব দাবি তুলছেন, যা আদতে বিচারহীনতার প্রতিষেধক না হয়ে উল্টো অবিচারের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে শাস্তি বা ফাঁসির দাবি তুলছেন, কেউ বলছেন দোররা মারার কথা, কেউ আসামির পক্ষে আইনজীবীর দাঁড়ানোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার দাবি তুলছেন, আবার কেউ প্রশ্ন করেছেন, ধর্ষক নিজে স্বীকারোক্তি দেওয়ার পরও কেন ডিএনএ টেস্ট লাগবে।
পাশাপাশি প্রকাশ্য শাস্তির বিরোধিতা করাকে কিছু ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল রীতিমতো ‘ধর্মবিরোধিতা’ আকারে হাজির করার চেষ্টা করছে। যাঁরা এসব মন্তব্য করছেন, তাঁরা সমাজ ও রাষ্ট্রে এবং সম্মতি উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এমনকি খোদ সরকারপ্রধানও জনসমাবেশে বলেছেন, ‘সরকার (পল্লবীর শিশু) হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি এক মাসের মধ্যে নিশ্চিত করবে এবং সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড।’
আমরা যে আলামত দেখতে পাচ্ছি, তা পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া ও জনপরিসরের জন্য এক অশনিসংকেত। দার্শনিক হানা আরেন্ড ইউরোপে সর্বাত্মকবাদের উদ্ভব নিয়ে লিখতে গিয়ে দ্রেফাসের ঘটনাকে (১৮৯৪ সালে ফ্রান্সে সংঘটিত এক রাজনৈতিক ও বিচারিক কেলেঙ্কারির ঘটনা) তৎকালীন ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করার অন্যতম গুরুতর মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
বিচারহীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসব কবেএই জটিল ঘটনা এবং তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁর একটা গুরুতর পর্যবেক্ষণ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই বিক্ষুব্ধ জনতা ছিল অস্থির প্রকৃতির, ভাষা ছিল কট্টর। কিন্তু তখন ইউরোপের অনেক বুদ্ধিজীবী বিক্ষুব্ধ জনতার এই ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। চারপাশের প্রচলিত নিয়ম ও ব্যবস্থার প্রতি বুদ্ধিজীবীদের ক্রোধ ছিল। ফলে এই বিক্ষুব্ধ জনতা যখন তাদের ভাষায় ও কর্মকাণ্ডে সেই নিয়মকানুন ভাঙতে শুরু করল, তখন সেই ধ্বংসাত্মক আচরণকে বুদ্ধিজীবীরা জনতার ‘বিশুদ্ধতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।
হানা দেখাচ্ছিলেন, সমাজের দায়িত্বশীল অংশও যখন বিক্ষুব্ধ ও চঞ্চল জনতাকে অথবা একইভাবে কোনো জনতুষ্টিবাদী নেতাকে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে শুরু করে, তখন তাঁরা একধরনের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পথই প্রশস্ত করেন। আমরাও সমাজের সচেতন অংশকে জনগণের ক্ষোভ থেকে উৎসারিত ভাষার সুরে কথা বলতে দেখছি। এই সুর বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সমাধান প্রস্তাব পেশ না করে উল্টো খোদ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকতাকেই খারিজ করে দিতে চায়।
বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনগণের বিচারের দাবিকে পুঁজি করে অবিচার কায়েমের অজস্র নজির বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আছে। ফলে বিচারের দাবি তোলার সময়ও সতর্ক থাকা দরকার। অতি দ্রুত বিচার এবং বিলম্বিত বিচার দুটোই ন্যায়বিচারের অন্তরায় হতে পারে। আমরা আজকে যে পরিস্থিতিতে এসে পড়েছি, তাতে যদি বিচারহীনতার সমাধান করতে চাই, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথাই ভাবতে হবে। অন্য কোনো ‘শর্টকাট’ পন্থা নেই।
দুই.
বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষোভের বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতারা ভুক্তভোগীদের দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। পল্লবীর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক দ্রুত ও ‘নির্দিষ্ট’ রায়ও হয়েছে। এখানে আরেকটা গুরুতর প্রশ্ন হাজির হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ওই মাসে দেশে ৫৯ মেয়েশিশুসহ ৭২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। প্রতি মাসেই এই সংখ্যার সামান্যই হেরফের হচ্ছে। একটি ঘটনার রায় যদি এত দ্রুত দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে বাকি ৫৯ বা ৭২টি ঘটনার বিচার কেন একইভাবে দ্রুত সম্পন্ন হবে না?
এখানেই আসলে ‘ভাইরাল’ সংস্কৃতির প্রভাব টের পাওয়া যায়। বিবিধ কারণে কোনো কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হয়ে পড়ে। এমনকি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের জন্য কোনো কোনো ঘটনা ‘অর্থকরী কনটেন্ট’ হিসেবেও হাজির হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হতে পারলেই কেবল তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে যে কেউ একে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক দিক হিসেবেও পাঠ করতে পারেন। কেননা এটি সরকার, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক মহলকে কোনো ইস্যুতে কথা বলতে বাধ্য করে। কিন্তু আরেক ধরনের প্রভাবও আছে। দেখা যায়, কেবল সে ঘটনারই ‘বিচার’ হয় বা বিচারের প্রতিশ্রুতি পায়, যা ‘ভাইরাল’ হওয়ার মতো উপাদানসমৃদ্ধ। পল্লবী বা মাগুরার ঘটনা আলোচিত হয়েছে বলেই রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু একই সময়ে একই ধরনের অন্যান্য ঘটনা স্রেফ ‘অনালোচিত’ হওয়ার কারণে চাপা পড়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন থেকেও আমরা জানতে পারছি, এসব ঘটনা ‘আলোচনায় না এলেই তদন্ত থেমে যায়’। (প্রথম আলো, ১৭ জুন ২০২৬) এখন ‘ভাইরাল’ বা ‘আলোচিত’ হওয়াটাই যদি বিচার পাওয়ার একমাত্র উসিলা হয়ে ওঠে, তবে নাগরিক হিসেবে আমাদের শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।
তিন.
বাংলাদেশে আমরা স্পষ্টত ‘পেনাল পপুলিজম’ বা দণ্ডমূলক জনতুষ্টিবাদেরই এক রূপ দেখতে পাচ্ছি। সহজ ভাষায় বলা যায়, বিচারিক প্রক্রিয়ার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থেকে উৎসারিত গণক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন রাজনৈতিক মহল সেই ক্ষোভ প্রশমনে কঠোর শাস্তির প্রতিযোগিতায় নামে। বলা হয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, বিদ্যমান আইন সেটাকে মোকাবিলা করতে পারছে না। একদিকে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থা, অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতার ভয়—জনমনের এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিবিদেরা অপরাধ দমনের চেয়ে অপরাধীদের ঘটা করে সাজা বা ‘শায়েস্তা’ করার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। আড়াল করে দেওয়া হয় বিচারপ্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাগুলো।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে, এমনকি বুদ্ধিজীবী মহলেও কঠোর শাস্তি দাবির প্রতিযোগিতা চলছে। এমনকি বিচারব্যবস্থার জন্য ন্যূনতম যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া মানা হয়, সেগুলোকেও আমলে না নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফার্নান্দো ক্যাসাল বলেছিলেন, যেকোনো জনতুষ্টিবাদ বিদ্যমান সংকটকে চিহ্নিত করে জনগণের ক্ষোভের ভাষা হাজির করতে পারলেও কোনো সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান প্রস্তাব করতে পারে না। এ ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই দেখা যাচ্ছে।
পল্লবীর শিশুটির বাবা কী কারণে বিচার চাইবেনএটা একটা দুষ্টচক্র। বিচারহীনতার কারণগুলো ক্ষমতাসীনেরা জিইয়ে রাখেন। বিচারব্যবস্থার প্রতি নাগরিকের অনাস্থা তৈরি হয়। এরপর যখন নাগরিকের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে, তখন সেই ক্ষমতাসীন বা রাজনৈতিক মহলই প্রাতিষ্ঠানিকতাকে এড়িয়ে দ্রুত বিচারের ‘নজির’ দেখাতে চান। ফলে দু-একটি ‘নজির’ এবং দিন দিন অপরাধীকে কঠোর হস্তে দমন করার বাসনা তৈরি হওয়া ছাড়া অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় আর কোনো উদ্যোগই এগোয় না।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এটা আচানক বিষয় নয়। ক্রসফায়ারের মতো রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পক্ষে জনসম্মতি উৎপাদনেও একই প্রক্রিয়া কাজে লাগানোর নজির আমরা অতীতে দেখেছি।
বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনগণের বিচারের দাবিকে পুঁজি করে অবিচার কায়েমের অজস্র নজির বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আছে। ফলে বিচারের দাবি তোলার সময়ও সতর্ক থাকা দরকার। অতি দ্রুত বিচার এবং বিলম্বিত বিচার দুটোই ন্যায়বিচারের অন্তরায় হতে পারে। আমরা আজকে যে পরিস্থিতিতে এসে পড়েছি, তাতে যদি বিচারহীনতার সমাধান করতে চাই, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথাই ভাবতে হবে। অন্য কোনো ‘শর্টকাট’ পন্থা নেই।
সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব