বাজারে এখন আম্রপালির রাজত্ব, দাম কেমন

· Prothom Alo

ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা। চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে একের পর এক ট্রাক থেকে নামছে আমভর্তি ক্রেট। শ্রমিকেরা কাঁধে করে সেগুলো তুলে নিচ্ছেন আড়তে। চারদিকে মিষ্টি ঘ্রাণ। তবে সবচেয়ে চোখে পড়ে একটিই দৃশ্য—প্রায় সব আড়তেই স্তূপ করে রাখা আম্রপালি।

Visit bettingx.bond for more information.

কয়েক সপ্তাহ আগেও এই বাজারে হিমসাগর, গোপালভোগ আর ক্ষীরশাপাতির দাপট ছিল। মৌসুমের শেষ ভাগে এসে সেই জায়গা দখল করেছে আম্রপালি। চাহিদা বাড়ায় সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা বেড়েছে এই আমের দামও।

গত বুধবার ফলমন্ডি ঘুরে দেখা গেল, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁর সাপাহার, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে ট্রাকে ট্রাকে আম আসছে। প্রতিটি ট্রাকে থাকে প্রায় ৫০০টি ক্রেট। প্রতি ক্রেটে গড়ে ২৫ কেজি হিসেবে একটি ট্রাকে আসে প্রায় সাড়ে ১২ টন আম। তবে মে ও জুনের তুলনায় এখন সরবরাহ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সেই প্রভাবই পড়ছে বাজারদরে।

মে মাসে গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি (হিমসাগর) ও লক্ষণভোগ দিয়ে আমের মৌসুম শুরু হয়। জুনে ধাপে ধাপে বাজারে আসে ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি। জুলাইয়ে যোগ হয় বারি আম-৪, আশ্বিনা ও গৌড়মতির মতো দেরিতে পাকা জাত। মৌসুমের শেষ ভাগে বাজারে মূলত আম্রপালি, ফজলি, আশ্বিনা ও গৌড়মতির সরবরাহ থাকে। পরে ধীরে ধীরে শেষ হয় আমের মৌসুম।

মেসার্স লাবিব এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আম্রপালি। ভালো মানের আম্রপালি পাইকারিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। মাঝারি মানের আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায়। সপ্তাহখানেক আগেও একই মানের আমের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা কম ছিল। মৌসুম শেষের দিকে চলে আসায় বাগান থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।’

মেসার্স আল আমিন ফ্রুটসের কর্ণধার মো. আবুল হোসেনও একই কথা বললেন। তিনি বলেন, ‘দাম একটু বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ক্রেতাদের আগ্রহ কমেনি। বরং এখন সবাই আম্রপালিই বেশি খুঁজছেন। স্বাদ আর মানের কারণে এ আমের চাহিদা শেষ সময় পর্যন্ত থাকে।’

পাইকারি বাজারে আম্রপালির পর সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে বারি-৪। এই আমের দাম ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা কেজি। কম পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে ল্যাংড়া; দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। কাটিমন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা এবং ফজলি ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি।

চাহিদা বাড়ায় সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা বেড়েছে এই আমের দামও

২ নম্বর গেটের ফল বিক্রেতা মো. নাজিম উদ্দিন গত বুধবার ফলমন্ডি থেকে ২০ ক্রেট আম্রপালি কিনছিলেন। তিনি বলেন, ‘দোকানে অন্য আম রাখলেও ক্রেতারা আগে আম্রপালির দাম জিজ্ঞেস করেন। এই আমের বিক্রি এখন বেশি।’

ফলমন্ডিতেই দেখা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী মো. মিরাজের সঙ্গে। তিনি এক ক্রেট আম্রপালি কিনেছেন। প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৮০ টাকা। মিরাজ বলেন, ‘বাসায় বাচ্চারা আম্রপালি পছন্দ করে। সপ্তাহখানেক আগেও এক ক্রেট নিয়েছিলাম। তখন প্রতি কেজির দাম পড়েছিল ৬২ টাকা। এখন ভালো মানের আমের দাম পড়ল ৮০ টাকা। দাম কিছুটা বেড়েছে।’

ফলমন্ডি ছাড়িয়ে আম্রপালি এখন ছড়িয়ে পড়েছে নগরের প্রায় সব বাজারে। ২ নম্বর গেট, চকবাজার, আগ্রাবাদ, আন্দরকিল্লা, রেয়াজউদ্দিন বাজার—যেদিকেই চোখ যায়, ফলের দোকানের সামনের সারিতে সাজানো এই আম। সড়কের পাশের ভ্যানগাড়ি থেকে শুরু করে ছোট-বড় ফলের দোকান—সবখানেই এখন এর আধিপত্য। মানভেদে খুচরা বাজারে আম্রপালি বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭০ থেকে ১৪০ টাকায়।

আম্রপালির এত কদর কেন

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাণিজ্যিক আমগুলোর একটি হলেও আম্রপালির জন্ম বাংলাদেশে নয়। ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে উত্তর ভারতের বিখ্যাত আমের জাত দোসেরির ফুলের পুরুষ পরাগ এবং দক্ষিণ ভারতের নীলমের স্ত্রী পরাগের সংকরায়ণের মাধ্যমে এই জাত উদ্ভাবন করা হয়। এরপর এটি এসে পৌঁছায় বাংলাদেশেও। ছোট আকৃতির গাছ, নিয়মিত ফলন, ঘনবসতিপূর্ণ বাগানে চাষের উপযোগিতা এবং উন্নত ফল মানের কারণে অল্প সময়েই এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় আমে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মসিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশেও বাণিজ্যিক আম চাষে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার ঘটেছে এই জাতের। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন জেলায় নতুন যেসব বাণিজ্যিক আমবাগান হয়েছে, তার বড় অংশেই রয়েছে আম্রপালি।

মো. মসিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট আম্রপালির প্রায় ১২০টি ধরন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছে। পরে সবচেয়ে ভালো বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ধরনটি বারি আম-৩ নামে অবমুক্ত করা হয় ১৯৯৬ সালে। এই জাতের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রতিবছর নিয়মিত ফল দেয়। ল্যাংড়া, ফজলি বা গোপালভোগের মতো অনেক দেশি জাতে এক বছর বেশি, পরের বছর কম ফল ধরার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু আম্রপালিতে সেই সমস্যা তুলনামূলক কম।

মো. মসিউর রহমান আরও বলেন, গাছ তুলনামূলক খাটো হওয়ায় একই জমিতে বেশি গাছ লাগানো যায়। উৎপাদন খরচও তুলনামূলক কম। বর্তমানে দেশে নতুন যেসব আমবাগান হচ্ছে, তার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই এই জাতের। সাধারণত জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাজারে পাওয়া যায়। একটি আমের গড় ওজন প্রায় ২৫০ গ্রাম। ফলের প্রায় ৭১ শতাংশই ভক্ষণযোগ্য। সাধারণ ব্যবস্থাপনায় হেক্টরপ্রতি ৩২ থেকে ৩৭ টন ফলন পাওয়া যায়। আর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উচ্চ ঘনত্বের বাগান করলে ফলন হেক্টরপ্রতি ৫৫ টন পর্যন্ত হতে পারে।

ফলমন্ডির আড়তদার মোহাম্মদ মাহবুব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমের মৌসুম যত শেষের দিকে যায়, একে একে গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাতি ও ল্যাংড়ার সরবরাহ কমে আসে। তখন বাজারের বড় অংশ দখল করে আম্রপালি। তুলনামূলক দেরিতে পাকে এবং বাজারে বেশি সময় পাওয়া যায় বলেই মৌসুমের শেষ ভাগে এটি ক্রেতাদের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে।’

Read full story at source