জিআরইতে ৩৪০-এ ৩৪০–ই পেয়েছেন তানভীর, কীভাবে?

· Prothom Alo

গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড এক্সামিনেশন-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো জিআরই। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর কিংবা পিএইচডি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য জিআরই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পরীক্ষায় ৩৪০–এর মধ্যে ৩৪০–ই পেয়েছেন তানভীর তানমিদ। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের বেটস কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়ছেন। পড়ুন তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ

Visit newssport.cv for more information.

তানভীর তানমিদ এখন যুক্তরাষ্ট্রের বেটস কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়ছেন

জিআরইতে ৩৪০-এ ৩৪০ ছিল আমার স্কোর। কোয়ান্টিটেটিভ রিজনিংয়ে পেয়েছিলাম ১৭০, ভার্বাল রিজনিংয়েও ১৭০। এই স্কোর পাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি শুনেছি, তা হলো কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে অনেক রিসোর্স, কৌশল বা প্রস্তুতির পদ্ধতির কথা বলা যায়। কিন্তু আমার পুরো প্রস্তুতিকে যদি একটি মূলনীতির মধ্যে নিয়ে আসতে হয়, তাহলে সেটা হলো ‘ভলিউম’। আমার প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য ছিল প্রচুর চর্চা করা। এত বেশি প্রশ্ন সমাধান করা, এত বেশি ধরনের সমস্যা দেখা এবং নিজের ভুলগুলো এতবার বিশ্লেষণ করা, যেন পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্ন দেখে নতুন মনে না হয়। প্রশ্ন নতুন হতে পারে, কিন্তু তার ধরন যেন পরিচিত লাগে। আমার প্রস্তুতির মূল দর্শন ছিল এটাই।

কেন জিআরই এবং আমার প্রস্তুতির মূল দর্শন ভলিউম

বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছে জিআরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রাম বা অর্থায়নের সুযোগের ক্ষেত্রে ভালো স্কোর আবেদনকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে জিআরইকে শুধু গণিত আর ইংরেজির পরীক্ষা হিসেবে দেখলে প্রস্তুতির শুরুতেই ভুল হতে পারে। এখানে শুধু জ্ঞান যাচাই করা হয় না, বরং সময়ের চাপের মধ্যে কত দ্রুত সমস্যা বুঝতে পারছি, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারছি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছি, সেটিও পরীক্ষা করা হয়। আমার কাছে জিআরই প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পরিচিতি তৈরি করা।

আইইএলটিএসে ৯-এ ৯ পেয়েছেন রাইসা, পড়ুন তাঁর পরামর্শ

শুরুতে একটি প্রশ্ন দেখে আমাকে ভাবতে হতো, কোন পদ্ধতিতে সমাধান করব, কোথায় ফাঁদ থাকতে পারে, কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই ধরনের শত শত প্রশ্ন সমাধান করার পর এই চিন্তার প্রক্রিয়া অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি চেয়েছিলাম পরীক্ষার দিনে এমন একটি অবস্থায় থাকতে, যেখানে প্রশ্ন দেখে আতঙ্কিত হতে হবে না। হয়তো নির্দিষ্ট প্রশ্নটি আগে দেখিনি, কিন্তু তার ধরন আগে বহুবার দেখেছি। তবে শুধু অনেক প্রশ্ন সমাধান করলেই হবে না। চর্চার সঙ্গে বিশ্লেষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রশ্ন ভুল হলে শুধু সঠিক উত্তর দেখে সামনে এগিয়ে যাইনি। চেষ্টা করেছি বুঝতে—ভুলটি কেন হলো।

ভুল সাধারণত তিন ধরনের ছিল। কখনো ধারণাগত সমস্যা ছিল, কখনো অসাবধানতার কারণে ভুল হয়েছে, আবার কখনো সময় ব্যবস্থাপনার সমস্যা হয়েছে। প্রতিটি ভুল আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্য আমি এরর লগ ব্যবহার করতাম। আমার কাছে প্রস্তুতির একটি পর্যায়ে নতুন বিষয় শেখার চেয়ে নিজের বারবার করা ভুলগুলো কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

কোয়ান্ট: পরিষ্কার ধারণা, সঙ্গে প্রচুর অনুশীলন

কোয়ান্টিটেটিভ রিজনিংয়ের ক্ষেত্রে আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল বেসিক ধারণাগুলো পরিষ্কার করা। জিআরইর গণিত খুব উচ্চপর্যায়ের নয়, তবে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সমাধান করার দক্ষতা প্রয়োজন। পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি, অনুপাত, শতকরা, সম্ভাবনা, পরিসংখ্যান, তথ্য বিশ্লেষণ, এগুলোর ভিত্তি পরিষ্কার থাকা জরুরি। এরপর আমার মূল মনোযোগ ছিল ‘টাইমড প্র্যাকটিসে’, অর্থাৎ সময়মতো শেষ করার চর্চা। শুধু প্রশ্নের সমাধান জানা যথেষ্ট নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হয়। প্রস্তুতির একটি পর্যায়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত প্রশ্ন সমাধান করেছি, সময় ধরে। এর পাশাপাশি কোন ধরনের প্রশ্নে বেশি ভুল হচ্ছে, সেটি আলাদা করে দেখেছি। আমার কিছু দুর্বল জায়গা ছিল। যেমন জ্যামিতি, ওয়েটেড অ্যাভারেজ এবং নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা সমাধানের ধরন। তখন আমি সব ধরনের প্রশ্ন একসঙ্গে করার পরিবর্তে দুর্বল জায়গাগুলোকে আলাদা করে অনুশীলন করেছি। কোয়ান্টে ভালো করার জন্য আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল গতি ও নির্ভুলতার সমন্বয়। শুধু দ্রুত করলে হবে না, আবার বেশি সময় নিয়ে নিখুঁত করার সুযোগও পরীক্ষায় থাকে না। অনেক চর্চা করার ফলে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলাম কোন প্রশ্নে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা সবচেয়ে কার্যকর। কোথায় সরাসরি সমাধান করব, কোথায় বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করব, কোথায় প্রশ্নের ফাঁদ এড়িয়ে যাব, এসব বিষয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

ভার্বাল: শব্দভান্ডার, যুক্তি ও অনুশীলনের সমন্বয়

অনেকেই মনে করেন জিআরইর ভার্বাল অংশ মানেই শুধু কঠিন শব্দ মুখস্থ করা। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা হলো, শুধু শব্দ জানলেই ভালো করা যায় না। ভার্বালে শব্দভান্ডারের পাশাপাশি বাক্যের যুক্তি বোঝা, লেখকের উদ্দেশ্য বুঝতে পারা এবং তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। আমার প্রস্তুতির সময় প্রায় ২ হাজার শব্দের ভোকাবুলারি (শব্দভান্ডার) প্রস্তুত করেছিলাম। তবে শুধু শব্দের অর্থ মুখস্থ করিনি। চেষ্টা করেছি শব্দটি কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার হয়, বাক্যে তার ভূমিকা কী, সেগুলো বোঝার। ‘টেক্সট কমপ্লিশন’ এবং ‘সেন্টেন্স ইকুইভ্যালেন্সের’ ক্ষেত্রে শুধু শব্দ জানা যথেষ্ট নয়। বাক্যের ধরন, ইতিবাচক না নেতিবাচক দিক, লেখকের মনোভাব, এসব বুঝতে হয়। রিডিং কম্প্রিহেনশনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। এখানে নিজের ধারণা দিয়ে উত্তর দিলে হবে না। প্যাসেজে (অনুচ্ছেদ) আসলে কী বলা হয়েছে, সেটিই বুঝতে হবে। ভার্বালের জন্য আমি নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন অনুশীলন করেছি। একই ধরনের ভুল বারবার দেখতে দেখতে একটা পর্যায়ে প্রশ্নের ফাঁদগুলো পরিচিত হয়ে যায়। আমার কাছে ভার্বালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, ভালো করতে হলে শুধু জানা নয়, প্রয়োগ করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

মক টেস্ট, রিসোর্স ও শেষ প্রস্তুতি

প্রস্তুতির শেষ দিকে মক টেস্ট আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি মক টেস্টের পর বিশ্লেষণ করতাম কোন প্রশ্ন ভুল হলো, কেন ভুল হলো, কোথায় বেশি সময় চলে গেল এবং কোন ধরনের চিন্তার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শুরুর দিকে আমার মক স্কোর ৩২৮ থেকে ৩৩০-এর আশপাশে ছিল। পরে ধীরে ধীরে স্কোর বাড়তে থাকে। কিন্তু স্কোরের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল প্রতিটি পরীক্ষার পর নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করা। প্রস্তুতিতে আমি অফিশিয়াল উপকরণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ, পরীক্ষার প্রশ্নের ভাষা, ধরন এবং ফাঁদ বোঝার জন্য মূল উৎসের উপকরণ সবচেয়ে কার্যকর। এর পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করেছি। তবে আমার বিশ্বাস, রিসোর্সের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং একটি রিসোর্সকে কত ভালোভাবে ব্যবহার করছি, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমার আগে আইবিএ ভর্তি পরীক্ষা এবং স্যাটের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা ছিল। এই প্রস্তুতিগুলো আমাকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধান করা, প্রশ্নের ভাষা বিশ্লেষণ করা, ভুল অপশন বাদ দেওয়া, এসব দক্ষতা জিআরই প্রস্তুতিতেও কাজে এসেছে। তবে আগের প্রস্তুতি শুধু একটি ভিত্তি তৈরি করেছিল। জিআরইর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট অনুশীলন এবং প্রচুর প্র্যাকটিসই আমাকে চূড়ান্ত ফলাফল পেতে সাহায্য করেছে।

Read full story at source