শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই

· Prothom Alo

দেশে শিশুধর্ষণের মামলার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান গভীর উদ্বেগজনক। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে শিশুধর্ষণের অভিযোগে ১ হাজার ৪৮৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৯৯৮। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে মামলা হয়েছিল ৭৫১টি। সেই হিসাবে দুই বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ। এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কোনোভাবেই একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। এগুলো শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর বিপর্যস্ত জীবন, একটি পরিবারের অসহায়ত্ব এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতা।  

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে পরিচিত পরিসরে। পুলিশের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, শিশুধর্ষণের বড় অংশের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি, স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরা জড়িত। মাগুরায় ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুটির বোনের শ্বশুরই ছিলেন অপরাধী। নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে তার মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে। ডিএনএ পরীক্ষায় ওই শিক্ষকই শিশুটির নবজাতকের জৈবিক বাবা বলে শনাক্ত হয়েছেন। এসব ঘটনা দেখায়, শিশুর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা পরিচিত সামাজিক পরিসরও সব সময় নিরাপদ নয়।  

Visit playerbros.org for more information.

অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা, ভয়, হুমকি ও চাপের কারণে ঘটনা গোপন করে। কেউ কেউ অভিযোগ করতে বিলম্ব করে। এতে ভুক্তভোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। নষ্ট হয়ে যেতে পারে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামতও। তাই শিশুধর্ষণকে পরিবারের ‘সম্মানের’ প্রশ্ন হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। অপরাধীর দায় কোনোভাবেই ভুক্তভোগী শিশুর ওপর চাপানো যাবে না। অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ, গোপনীয় ও ভুক্তভোগীবান্ধব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পল্লবীতে শিশুধর্ষণ ও হত্যার মামলায় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে রায় হওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এটি এখনো ব্যতিক্রম। উচ্চ আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৩৬৫টি মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলছে। বিচার দীর্ঘায়িত হলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়ে। সাক্ষ্য ও আলামত দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। অন্যদিকে অপরাধীদের কাছে ভুল বার্তা যায় যে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

শুধু মৃত্যুদণ্ডের বিধান বা বিচ্ছিন্নভাবে দ্রুত রায় দিয়ে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। প্রয়োজন দক্ষ তদন্ত, সময়মতো স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বৈজ্ঞানিকভাবে আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীর নিরাপত্তা, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও মানসিক পুনর্বাসন। থানা, হাসপাতাল, সমাজসেবা অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। প্রতিটি মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও জরুরি।  

একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক কাজকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের বয়স উপযোগীভাবে নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শেখাতে হবে। কোথায় এবং কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে, সে ধারণাও দিতে হবে। পরিবারকে সন্তানের কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণ ও শিশু সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শিশুর অধিকার সম্পর্কে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। রাষ্ট্রকে এখন দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের অপরিহার্য দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে আর কোনো শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই।

Read full story at source