‘আমার তিন স্বজন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, কিছুই জানি না’

· Prothom Alo

নেপালে বিপর্যয়ের আগে জেলাটিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন তারা থাপা মাগারের তিন স্বজন। আকস্মিক বন্যার পর থেকে তাঁদের আর কোনো খোঁজ নেই। ফোন বন্ধ। যোগাযোগও করা যাচ্ছে না। তাঁরা কোথায় আছেন, কেমন আছেন—পরিবারের কেউ জানেন না। চট্টগ্রামে বসে প্রতিটি মুহূর্ত উৎকণ্ঠায় কাটছে তারার। তিনি বলেন, ‘আমার তিন স্বজন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন; কিছুই জানি না। দেশ থেকে এত দূরে বসে শুধু অপেক্ষা করছি। এর চেয়ে অসহায় সময় আর কী হতে পারে।’

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

২০ বছর বয়সী তারা চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পাবলিক হেলথ বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বাড়ি নেপালের রামেছাপ জেলার খাঁড়া দেবী পৌরসভায়। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, ‘আমি আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন। এমন ভয়াবহ ঘটনা কল্পনাও করিনি।’

গত বুধবার নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ধসে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ হয়েছে। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এখনো প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী রয়েছেন।

তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ, পাথর ও মাটির বড় ধস নদীতে পড়ার পর ভোতেকোশি অববাহিকায় কাদা-পাথরমিশ্রিত প্রবল ঢল নামে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঢল ভাটিতে ত্রিশূলী নদী হয়ে নেমে গিয়ে বসতি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। দুর্গম এলাকায় এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। বন্যা সরাসরি তিনটি জেলাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নেপালের ৪০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। দুর্যোগের পর থেকে তাঁরা নিজেদের পরিবারের খোঁজ নিচ্ছেন। কেউ যাচাই করা তথ্য ও জরুরি যোগাযোগের নম্বর ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার দুর্গত মানুষের জন্য সহায়তা সংগ্রহের উদ্যোগ নিচ্ছেন।

শিক্ষার্থী তারা প্রথম বন্যার খবর পান ফেসবুকে। খবর দেখেই পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। শহরে থাকা নিকট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাঁরা নিরাপদে আছেন। তবে ইন্টারনেট সমস্যার কারণে গ্রামের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে

তারার বাড়ির এলাকাও এখন পর্যন্ত নিরাপদ। বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই। কিন্তু নিখোঁজ তিন স্বজন যে জেলায় কাজ করছিলেন, সেখানকার যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফোন নেটওয়ার্ক ও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় নির্ভরযোগ্য তথ্যও মিলছে না।

এসব তথ্য উল্লেখ করে তারা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলাম। স্বজনদের ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় আছেন, কী হয়েছে—কেউ বলতে পারছিলেন না। তিন স্বজন ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা নিরাপদ আছেন।’

নিজের এলাকায়ও বন্যা শুরু হতে পারে কি না, সেই আশঙ্কা রয়েছে তারার। তবে তাঁর সমস্ত উদ্বেগ এখন নিখোঁজ তিন স্বজনকে ঘিরে। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের মতো অনেক পরিবার নিখোঁজ মানুষের একটি খবরের অপেক্ষায় আছে। এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ তাঁদের খুঁজে বের করা।’

বন্ধুর মামাও নিখোঁজ

নেপালের তানাহুনের বাসিন্দা সুস্মিতা রোকাও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পাবলিক হেলথ বিভাগের শেষ বর্ষে পড়ছেন। তাঁর মা-বাবা কাঠমান্ডুতে নিরাপদে আছেন। তানাহুনে তাঁদের বাড়িরও বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে দুর্যোগে তাঁর পরিচিত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সুস্মিতার এক প্রতিবেশী সেনা কর্মকর্তা বন্যার কবলে পড়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মামা রাসুয়ায় কর্মরত ছিলেন। দুর্যোগের পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

সুস্মিতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর প্রথমেই বাড়িতে ফোন করি। মা-বাবা নিরাপদ আছেন জেনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু পরিচিত একজন মানুষ এখনো নিখোঁজ। তাঁর পরিবার কী অবস্থার মধ্যে আছে, ভাবলেই কষ্ট হয়।’

ঘটনার এক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্যার খবর পেয়েছিলেন সুস্মিতা। এর পর থেকে তিনি নিয়মিত পরিবার ও পরিচিতজনদের খোঁজ নিচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, উজানের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে ভেসে আসা মরদেহ তানাহুনের ত্রিশূলী নদীতেও উদ্ধার হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জেনেছেন তিনি।

নেপালের বিপর্যয় হিমবাহের সামনের অংশ ভেঙে পড়ার কারণে

সুস্মিতা বলেন, ‘কেউ স্বজনকে খুঁজছেন, কেউ একটি ফোনের অপেক্ষায় আছেন। আবার কোথাও মরদেহ পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু পরিচয় জানা যাচ্ছে না। পরিবারগুলো অন্তত জানতে চায়, তাদের প্রিয়জন কোথায়।’

বাংলাদেশে থাকা নেপালি শিক্ষার্থীরা এখন একে অন্যের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। সুস্মিতা জানান, উইমেন নেপালি স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন বাংলাদেশের মাধ্যমে নেপাল দূতাবাসের সমন্বয়ে নেপাল সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুদানের অনলাইন ঠিকানা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার, ত্রাণ, চিকিৎসা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনে সহায়তার আবেদনও জানাচ্ছেন তাঁরা।

সুস্মিতা বলেন, ‘আমরা নেপালে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছি না। তবে সঠিক তথ্য ও সহায়তার আবেদন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

‘ভয়ানক ঘটনা’

নেপালের ললিতপুরের বাসিন্দা অনিতা তিমালসিনার পরিবারের কেউ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হননি। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে তাঁদের বাড়ি দূরে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ও ভিডিও তাঁকে বিচলিত করে তুলেছে।

২২ বছর বয়সী অনিতা পাবলিক হেলথ বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অনিতা বলেন, ‘মনটা নেপালে পড়ে আছে। কোনো কাজে মন বসাতে পারছি না। চোখের সামনে বারবার বন্যার ছবি আর ভিডিও ভেসে উঠছে। দূরে বসে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে।’

ফেসবুকে প্রথম বন্যার খবর দেখেছিলেন অনিতা। এরপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সবাই নিরাপদে আছেন। তবে ঘটনার ভয়াবহতা তাঁদেরও স্তব্ধ করে দিয়েছে। অনিতা বলেন, ‘ফেসবুকে বন্যার ছবি ও ভিডিও দেখেছি। এটি ভয়ানক ঘটনা। এমন বিপর্যয় হবে, কেউ কল্পনাও করেননি। কত মানুষ ঘরবাড়ি, জমি, পরিবার ও জীবিকা হারিয়েছেন। তাঁদের কষ্ট কেমন, দূরে বসে তা শুধু অনুভব করার চেষ্টা করছি।’

দুর্গত এলাকায় এখন উদ্ধারকাজের পাশাপাশি আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, কাপড় ও ওষুধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিন শিক্ষার্থী। তাঁরা নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের করা এবং আটকে পড়া মানুষের কাছে উদ্ধারকারীদের পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

অনিতা বলেন, ‘এমন কঠিন সময়ে ছোট একটি সহায়তাও কারও জন্য অনেক বড় হতে পারে। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াক।’

নেপালে নিহত বেড়ে ৩৮৯, নিখোঁজদের ৬৫ জন আমেরিকান, যুক্তরাজ্যের ৩৩

Read full story at source