লবণাক্ত পানি ছাড়া চিংড়ি বাঁচতে পারে না কেন
· Prothom Alo

চিংড়ির শরীরটাকে একটি খোলা দরজার মতো ভাবতে পারেন। মাছের গায়ে আঁশ থাকে, চামড়ায় থাকে একটি প্রতিরক্ষার স্তর। কিন্তু চিংড়ির বাইরের শক্ত খোলসটা মোটেও পানি আটকাতে পারে না। এর ভেতর দিয়ে পানি প্রায় অবাধেই ভেতরে ঢোকে, আবার বেরিয়েও যায়। ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে পুরো ব্যাপারটির আসল রহস্য।
Visit moryak.biz for more information.
আমাদের শরীরে বাড়তি পানি ও লবণ সামলানোর জন্য যেমন কিডনি রয়েছে, চিংড়িরও তেমন একটি নিজস্ব ব্যবস্থা আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম অসমোরেগুলেশন বা অভিস্রবণ-নিয়ন্ত্রণ। শুনতে খুব কঠিন লাগছে? বিষয়টি আসলে খুবই সহজ। শরীরের ভেতরে ও বাইরে লবণের পরিমাণ সমান না থাকলে, পানি নিজে নিজেই একদিক থেকে আরেক দিকে ছুটতে শুরু করে। একে বলা হয় অসমোসিস বা অভিস্রবণ। এটি প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়ম, কেউ না ঠেকালেও পানি সব সময় কম ঘনত্বের দিক থেকে বেশি ঘনত্বের দিকে চলে যায়।
কোরাল মাছকে এত লাল দেখায় কেনআমাদের শরীরে বাড়তি পানি ও লবণ সামলানোর জন্য যেমন কিডনি রয়েছে, চিংড়িরও তেমন একটি নিজস্ব ব্যবস্থা আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম অসমোরেগুলেশন বা অভিস্রবণ-নিয়ন্ত্রণ।
এবার কল্পনা করুন, একটি চিংড়িকে হঠাৎ মিষ্টি পানিতে ফেলে দিলে কী হবে! ওর শরীরের ভেতরে লবণের ঘনত্ব বাইরের পানির চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বাইরের মিষ্টি পানি হুড়মুড় করে চিংড়ির শরীরে ঢুকতে থাকবে এবং চিংড়ি সেটি কোনোভাবেই আটকাতে পারবে না। একসময় কোষগুলো ফুলে উঠবে, ভেতরে পানি টইটম্বুর হয়ে যাবে এবং শেষমেশ কোষ ফেটেও যেতে পারে। উল্টো দিকে, চিংড়িটি খুব বেশি লবণাক্ত পানিতে ফেললে শরীরের পানি বাইরে বেরিয়ে যাবে, ফলে চিংড়িটি ভেতর থেকে শুকিয়ে যাবে। অর্থাৎ দুই দিকেই তার জন্য মৃত্যু অপেক্ষা করছে। এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানের সরু একটি গলিপথ দিয়েই কেবল তাদের বেঁচে থাকতে হয়।
তাই লবণাক্ত পানি চিংড়ির জন্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত।
লইট্যা মাছ কেন মাথা উঁচু করে সাঁতার কাটেচিংড়ির শরীরের ভেতরে লবণের ঘনত্ব বাইরের পানির চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বাইরের মিষ্টি পানি হুড়মুড় করে চিংড়ির শরীরে ঢুকতে থাকবে এবং চিংড়ি সেটি কোনোভাবেই আটকাতে পারবে না।
সব চিংড়ি কি একই রকম
সব চিংড়ি অবশ্য এক রকম নয়। বাগদা চিংড়ি কিংবা গলদা চিংড়ির জীবনচক্র একেবারে আলাদা গল্প বলে। গলদা চিংড়ি বড় হয় মিষ্টি পানিতে, নদীতে বা পুকুরে। কিন্তু ডিম পাড়ার সময় হলে স্ত্রী চিংড়ি মোহনার কাছাকাছি নোনা পানির দিকে ছুটে যায়। কেন যায়? কারণ, তার লার্ভা বা বাচ্চা চিংড়িদের প্রথম কয়েক দিন বেঁচে থাকার জন্য লবণাক্ত পরিবেশের দরকার হয়। বাগদা চিংড়ি আবার পুরো উল্টো পথে চলে! এরা জন্মায় সাগরে, বড় হয় মোহনার লবণ ও মিষ্টি মেশানো আধা নোনা পানিতে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ব্র্যাকিশ ওয়াটার। তারপর ডিম পাড়তে আবার গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায়—যেমন সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের ঘেরে—এই জ্ঞানটিই চাষিদের হাতে-কলমে কাজে লাগে। রিফ্র্যাক্টোমিটার নামে একটি যন্ত্র দিয়ে ঘেরের পানিতে লবণের মাত্রা নিয়মিত মাপা হয়। বাগদা চিংড়ির জন্য আদর্শ লবণাক্ততা হলো ১৫ থেকে ২৫ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড)। এর চেয়ে কমে গেলে চিংড়ির বৃদ্ধি থমকে যায় এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। আবার বেশি হয়ে গেলেও উল্টো বিপদ দেখা দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীর মিষ্টি পানির প্রবাহ যখন কমে যাচ্ছে এবং বহু জায়গায় লবণাক্ততা অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রাকৃতিক ভারসাম্যটাই নষ্ট হয়ে পড়ছে। উপকূলের চাষিরা এখন প্রায়ই বলেন, ‘পানির স্বভাব বদলে গেছে।’
ছুরি মাছ কি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারেবাগদা চিংড়ি জন্মায় সাগরে, বড় হয় মোহনার লবণ ও মিষ্টি মেশানো আধা নোনা পানিতে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ব্র্যাকিশ ওয়াটার। তারপর ডিম পাড়তে আবার গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়।
চিংড়ির বেঁচে থাকার যুদ্ধ
এই ভারসাম্য বজায় রাখার পেছনে চিংড়ির কিছু নির্দিষ্ট অঙ্গ কাজ করে। চিংড়ির মাথার কাছে একজোড়া গ্রন্থি থাকে, যার নাম অ্যান্টেনাল গ্ল্যান্ড। এটি অনেকটা কিডনির মতোই কাজ করে। এ ছাড়া এদের ফুলকার মধ্যে বিশেষ কিছু কোষ থাকে, যেগুলো দরকার অনুযায়ী সক্রিয়ভাবে লবণ পাম্প করে শরীরের ভেতরে বা বাইরে নিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি খরচ হয়। মানে, চিংড়িকে খেতেও হয়, বাঁচতেও হয়, আর সেই সঙ্গে অবিরাম এই লবণ-পানির হিসাব মেলাতে হয়। অর্থাৎ একসঙ্গে তিন-তিনটি কাজ! খুব ক্লান্তিকর মনে হচ্ছে, তাই না? প্রকৃতির চোখে অবশ্য এটি খুবই স্বাভাবিক, চিংড়ির রোজকার রুটিন মাত্র।
এবার একটি মজার তথ্য দিই। যেসব চিংড়ি লবণ ও মিষ্টি উভয় পানিতেই থাকতে পারে, তাদের অভিযোজনক্ষমতা অসাধারণ। কিন্তু সব চিংড়ির এই ক্ষমতা নেই। কিছু প্রজাতি একেবারে স্টেনোহ্যালাইন প্রকৃতির—লবণের পরিমাণ সামান্য এদিক-ওদিক হলেই এরা মারা যায়। গভীর সমুদ্রের চিংড়িগুলো সাধারণত এই দলেই পড়ে। লাখ লাখ বছর ধরে এদের শরীর এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে নির্দিষ্ট লবণাক্ততার বাইরে গেলেই এদের শারীরিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
চিতল মাছ কি সত্যিই জীবন্ত জীবাশ্মচিংড়ির ফুলকার মধ্যে বিশেষ কিছু কোষ থাকে, যেগুলো দরকার অনুযায়ী সক্রিয়ভাবে লবণ পাম্প করে শরীরের ভেতরে বা বাইরে নিয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি খরচ হয়।
অ্যাকুয়ারিয়ামে কি চিংড়ি পোষা যায়
আরেকটি প্রশ্ন হয়তো প্রায়ই আমাদের মনে আসে, অ্যাকুয়ারিয়ামে কি চিংড়ি পোষা যায়? হ্যাঁ, যায়; তবে তা একটু হিসাব কষে করতে হয়। অনেকেই মিষ্টি পানিতে ছোট রঙিন চিংড়ি পোষেন। কারণ, এই প্রজাতিগুলো আসলে মিষ্টি পানিরই বাসিন্দা, সামুদ্রিক নয়। কিন্তু বাজারের সেই বড় রুপালি চিংড়ি—যেগুলো আমরা সাধারণত খেয়ে থাকি—সেগুলোকে মিষ্টি পানির অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মরে যাবে। পার্থক্যটা আসলে প্রজাতির, যা সব সময় শুধু নাম দেখে বোঝা যায় না।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজিকই মাছ পানি ছাড়াও অনেক সময় বেঁচে থাকে কীভাবে