নিজকলমোহনায় ক্লারা লিন্ডেন

· Prothom Alo

গল্পটি ১৯৯৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। তখনো প্রথম আলোর অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই এত দিন গল্পটি ছিল শুধু কাগজের পাতাজুড়ে। আজ অনলাইন পাঠকের কাছে তুলো ধরা হলো।

বানের পৃষ্ঠে দিয়া বান

Visit newsbetting.bond for more information.

পেটের ছেলে গনে আনে

নামে মাসে করি এক

আটে হরে সন্তান দেখ

এক তিন থাকে বান

তবে নারীর পুত্র জান

দুই চারি থাকে ছয়

অবশ্য তার কন্যা হয়

থাকিলে তার শূন্য হাত

হবে নারীর গর্ভপাত

ছেলে হবে, গণনা করে বলে কাশমতি বেওয়া। চার মেয়ের পর এবার ছেলে না হলে তালাক, স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল আব্বাসের বাবা। কিন্তু গণনা অব্যর্থ। জন্ম হলো আব্বাসের।

কিছুক্ষণ আগে আব্বাস গ্লুকোজ বিস্কুট দিয়ে গেছে ক্লারা লিন্ডেন আর মাহজাবিন খানকে। কাশমতি বেওয়াই তাকে বিস্কুট আনতে পাঠিয়েছিল নিকটস্থ মুদির দোকানে। ঢেঁকিঘরে পিঁড়ির ওপর বসে আছে তারা তিনজন। শ্বেতাঙ্গ ক্লারা লিন্ডেন, বাদামি মাহজাবিন খান আর শ্যামবর্ণ কাশমতি বেওয়া। বেশ একটা বর্ণালি রচিত হয়েছে ঢেঁকিঘরে। অবশ্য ঘর ঠিক নয়, একটা ছাউনিমাত্র। নুয়ে থাকা ক্লান্ত ঢেঁকির ওপর একটা ছনের ছাউনি। চারদিক দিয়ে হাওয়া আসছে।

বিস্কুট দিয়ে ফিরে যাওয়ার পথে খানিকটা দূরত্বে জামগাছতলায় দাঁড়িয়ে আব্বাস, তার বন্ধুকে চুপি চুপি একটা তথ্য জানাচ্ছে। বলছে, ভিসিআরে সে দেখেছে ক্লারার মতো বিদেশি মেয়েরা উলঙ্গ হয়ে নানাবিধ কুকর্ম করে থাকে। আব্বাস এই প্রথম কোনো শ্বেতাঙ্গকে সশরীর দেখছে। শ্বেতাঙ্গ বিষয়ে এই ধারণা সে অর্জন করেছে সম্প্রতি হাটে গোপনে দেখা নীল ছবি থেকে। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তারা দুই বন্ধু আড়চোখে ক্লারাকে দেখে।

ক্লারার হাতে কলম, নোটবই, মাহজাবিনের হাতে মাইক্রোক্যাসেট, কাশমতির হাতে একটা ঝরা বাঁশপাতা।

গণনামন্ত্রটির অনুবাদ শোনার জন্য আগ্রহে অপেক্ষা করে ক্লারা। কিন্তু মন্ত্র অনুবাদ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে মাহজাবিন। ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কীভাবে ইংরেজিতে তরজমা করবে এই গণনা। মাহজাবিন ইংরেজি সাহিত্যের তুখোড় ছাত্রী; কিন্তু গর্ভগণনার মন্ত্র ইংরেজি অনুবাদের ব্যাপারটি তার জন্য অভূতপূর্ব। তা ছাড়া নাগরিক মাহজাবিন ঢেঁকিঘর ইত্যাদি গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে খুব একা স্বাচ্ছন্দ্যও বোধ করছে না। পত্রিকায় ক্লারার বিজ্ঞাপন দেখে নিছক কৌতূহলে তার দোভাষী হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছে সে। মাহজাবিন অবশেষে ইংরেজিতেই বলে, ‘শোনো ক্লারা, মন্ত্রটা তো ক্যাসেটে রইল, আমি না হয় সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে পরে তোমাকে তরজমা করে দেব।’ তাত্ক্ষণিকভাবে মন্ত্রটার রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হলো বলে ক্লারা কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন।

গতকাল নিজকলমোহনা বিলে বাউথ হয়েছে। যৌথ মাছশিকার উত্সব। মহাকাণ্ড। সবচেয়ে বেশি মাছ উঠেছে আব্বাসের জালে। সেই আব্বাসের জন্মবৃত্তান্তের কথা হচ্ছিল।

কিন্তু সে বৃত্তান্তে যাওয়ার আগে নিজকলমোহনা গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ ধাত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয় এ–যাবৎ কয়টি প্রসব সে করিয়েছে। কাশমতি কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। কোন প্রসবগুলোর কথা সে বলবে, সে তো শুধু মানুষ নয়, গাভি এবং ছাগিরও একজন দক্ষ ধাত্রী। মাহজাবিনের মাধ্যমে ক্লারা শুধু মানবশিশুর প্রসব বিষয়েই জানতে চায়। তাতে কাশমতি আশ্বস্ত হয়। কারণ, সে হিসাব তার কাছে আছে। আঙুলে ধরা বাঁশপাতাটি ঘোরাতে ঘোরাতে কাশমতি বলে, ‘ম্যালা করছি। এক হজ তো পার করছি সেই কবে, আরেক হজ হয় হয়।’

হজের ব্যাপারটি মাহজাবিন ও ক্লারা কারও কাছেই স্পষ্ট হয় না। কাশমতিকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। কাশমতি বলে, ‘আপনেরা আগে বিস্কুট খান।’ সে উঠে গিয়ে টিউবওয়েল থেকে জগ ভরে ঠান্ডা, স্বচ্ছ পানি আর গ্লাস এনে ঢেঁকিঘরে রাখে। তারপর আবার ঘরের ভেতর গিয়ে নিয়ে আসে লম্বা একটি দড়ি। দড়িটিতে অসংখ্য গিঁট দেওয়া। ক্লারা ও মাহজাবিন বিস্কুটে কামড় দেয়। কাশমতি তাদের বোঝায়, দড়ির এই গিঁটগুলো হচ্ছে একেকটি প্রসব। একেকটি প্রসব করিয়ে সে এই দড়িতে একটি করে গিঁট দিয়ে রাখে। সে বলে, ‘লেখাপড়া নাই তো, এটাই হইল আমার হিসাবের খাতা।’ সে আরও জানায়, ১০১টি বাচ্চা প্রসব করাতে পারলে এক হজের সওয়াব হয়। কাশমতি গুনে দেখায়, তার দড়িতে গিঁট রয়েছে ১৮২টি। সে আশা রাখে, তার দুই হজ সম্পন্ন হবে অচিরেই। কাশমতির কথা শুনতে শুনতে কিছুক্ষণ বিস্কুট চিবানো ভুলে যায় মাহজাবিন এবং তারপর তরজমা শুনতে শুনতে ক্লারা।

‘ওই ছ্যামড়ারে দিয়া আমার এক হজ পুরা হইছে।’ আব্বাসকে দেখিয়ে বলে কাশমতি বেওয়া। শুধু তা–ই নয়, আব্বাসের জন্মবৃত্তান্তটি তার কাছে স্মরণীয়, কারণ তা ছিল নাটকীয়।

ওদিকে কাশমতি আঙুল দিয়ে তাকেই দেখাচ্ছে দেখে ভড়কে যায় দূরে দাঁড়ানো আব্বাস। কারণ, সে তখনো শ্বেতাঙ্গদের যৌনতা বিষয়ে আলাপ করছিল। ঢেঁকিঘরের কারও তা শোনার কথা নয়, তবু আব্বাস খানিকটা ভীত হয়ে দ্রুত খেতে নেমে নিড়ানিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ক্লারা লিন্ডেন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। নিজকলমোহনা গ্রামে এসেছে গবেষণার উদ্দেশে। তার গবেষণার বিষয় প্রসব, তৃতীয় বিশ্বের গ্রামীণ মহিলাদের প্রসবসংক্রান্ত ভাবনা, বিশ্বাস, চর্চা–সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের অভিযান শুরু করেছে সে। ঢেঁকিঘরে আলাপ চলছে। অন্যান্য ঘরের বেড়ার ফাঁকফোকরে তখন কৌতূহলী চোখ।

কাশমতি বেওয়া আব্বাসের মায়ের শঙ্কার কথা বলে। ইতিপূর্বে চারটি কন্যাসন্তান হয়েছে তার। এবার প্রয়োজন একটি পুত্রসন্তানের, নইলে তার সংসারে নেমে আসবে এক গভীর বিপর্যয়। অনিবার্য তালাক হয়ে যাবে তার। আব্বাসের মা তাই দিনরাত কাঁদে। ‘কী হইব আমার বু?’ কাশমতি যদিও গণনা করে বলেছে যে এবার ছেলেই হবে, তবু ভয় যায় না তার। কাশমতি বেওয়া তাই আব্বাসের মায়ের সাত মাসের গর্ভকালীন সাত মাইস্যা গীত গাওয়ার ব্যবস্থা করে। ছেলে হওয়ার গান। কয়জন মহিলা মিলে আব্বাসের মাকে ঘিরে সেই গান গায়। খুবই কৌতূহলী হয়ে ওঠে ক্লারা। ‘গানটা কি আমাদের শোনানো যায় একটু?’ মাহজাবিনের অনুবাদে এই অনুরোধ শুনে কাশমতি লজ্জিত হয়ে পড়ে। বলে, তার গলায় সুর নেই, ভালো গান গাইতে পারে না। তবু ক্লারা অনুরোধ অব্যাহত রাখে। প্রসবকে ঘিরে যা কিছু ঘটে, সবই তার জানা প্রয়োজন। শেষে কাশমতি আম্বিয়াকে ডাকে, যার গলায় সুর আছে বলে কাশমতি জানায়। কাশমতি আর আম্বিয়া ঢেঁকিঘরের মাঝখানে দাঁড়ায়। তারা লজ্জায় আড়ষ্ট। তারা একে অন্যের কাঁধে হাত রাখে। তারপর তালে তালে এক পা সামনে আবার এক পা পেছনে নিয়ে চাপাকান্নার মতো সুরে গাইতে থাকে—

চাম্পা হয়েছে মা গো সাত মাসের গর্ভ, বল হায় হায় গো

চাম্পা খাবে মা গো ঠান্ডা দরিয়ার পানি, বল হায় হায় গো

চাম্পা খাবে মা গো মিঠা দরিয়ার পানি, বল হায় হায় গো

কোথায় পাব এখন ঠান্ডা দরিয়ার পানি, বল হায় হায় গো

কথা বলতে বলতে মা গো চাম্পার নয় মাস হলো, বল হায় হায় গো

কথা বলতে বলতে মা গো চাম্পার দশ মাস হলো, বল হায় হায় গো

কথা বলতে বলতে মা গো চাম্পা কাবু হলো, বল হায় হায় গো

আমারে আইনা দাও মা বাবার দেশের দাইয়ানি, বল হায় হায় গো।

কোথায় পাব মা গো এখন বাবার দেশের দাইয়ানি, বল হায় হায় গো

কথা বলতে বলতে মা গো চাম্পার ব্যাটাছেলে হলো, বল হায় হায় গো।

গান শেষ করে কাশমতি ও আম্বিয়া খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাততালি দেয় ক্লারা। সুরের ভেতর একটা কেমন বিষণ্নতা। ক্লারা ও মাহজাবিন দুজনই আচ্ছন্ন ছিল এতক্ষণ। এ গীত অনুবাদ করতে বিশেষ সমস্যা হয় না মাহজাবিনের। গানটির সারল্যে মুগ্ধ হয় ক্লারা। একেকটি লাইনে চমত্কার ফুটে উঠেছে গর্ভের ধারাবাহিক পর্যায়! বিশেষ করে ওই পঙ্‌ক্তিটি, ‘আমারে আইনা দাও মা বাবার দেশের দাইয়ানি’ চমত্কার মনে হয় ক্লারার। এই পঙ্‌ক্তিটি নিয়ে সে আলাপ করে মাহজাবিনের সঙ্গে। প্রসব বেদনার ওই ব্যক্তিগত কষ্টের মুহূর্তে মেয়েটির মনে পড়ছে তার বাবার বাড়ির ধাত্রীর কথা, ব্যাপারটি তাত্পর্যপূর্ণ। স্বামীর বাড়ির অনাত্মীয় পরিবেশে সে প্রত্যাশা করছে বাবার বাড়ির মমতার স্পর্শ। এখানে যে মেয়েটির একটি অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের একজন নারীর গোপন বেদনা। বিশ্লেষণটি বেশ উপভোগ করে মাহজাবিন।

তাদের আলাপের এ পর্যায়ে একজন কাঁচাপাকা দাড়ি, তেলচকচকে চুল, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষ উঠান পেরিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসেন। তাঁর চোখে কৌতূহল ও উদ্বেগ। তিনি ক্লারা ও মাহজাবিনের কাছে এসে বলেন, ‘স্লামালেকুম, মেরা নাম হ্যায় আব্দুল কুদ্দুস। ম্যায় ইস ইউনিয়ন কা মেম্বার হু।’

কাশমতি ঘোমটা ভালোভাবে টেনে বসে। আব্দুল কুদ্দুসের উর্দু বলাটা বেশ অদ্ভুত শোনায়। আসলে ক্লারা তো বটেই, তার পাশাপাশি মাহজাবিনকেও তার মনে হয়েছে বিদেশি। উনি ভেবে দেখেছেন যে বাংলা বললে এখানে কাজ হবে না, বিদেশি ভাষা বলতে হবে এবং উর্দুই একমাত্র বিদেশি ভাষা, যা আব্দুল কুদ্দুস কিছুটা জানেন। অতএব তিনি উর্দুতেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু মাহজাবিন বাংলায় কথা বলে উঠলে তিনি খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি ভেবেছিলেন এ সুযোগে তাঁর বিদেশি ভাষার পারদর্শিতা অতিথিদের দেখাবেন; কিন্তু সে সুযোগ তিনি পেলেন না। এ অঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এখানে কী ঘটছে তা জানার দায়িত্ববোধ করেছেন আব্দুল কুদ্দুস। একটু উদ্বিগ্নও ছিলেন। ভেবেছেন কোনো বিপদ–আপদ নয় তো? মাহজাবিন নিজকলমোহনায় তাদের আসার কারণ আব্দুল কুদ্দুসকে জানায়। পাশ থেকে কাশমতি বেওয়া হেসে বলে, ‘পোলাপাইন কেমনে খালাস করি, এইগুলান জানতে চায়।’

আব্দুল কুদ্দুস নির্ভার বোধ করেন।

বলেন, ‘অ’। এখানে যে রিলিফ, ঋণ বা তদন্তের কোনো ব্যাপার ঘটছে না, জেনে স্বস্তি হয় তাঁর। এসব নিতান্ত মেয়েলি ব্যাপারে তিনি তেমন আগ্রহ বোধ করেন না। শুধু কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বেশ বিগলিত হাসিতে ক্লারাকে দেখিয়ে মাহজাবিনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘উনি কোন দ্যাশের মানুষ?’ মাহজাবিন জানায়। বিগলিত হাসিটি মুখে স্থির রেখেই আব্দুল কুদ্দুস আপাদমস্তক ক্লারাকে দেখেন। তারপর ‘আপনারা তাহলে আলাপ করেন’ বলে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে চলে যান।

ক্লারা মাহজাবিনের কাছে আব্দুল কুদ্দুসের পরিচয় জেনে নেয় এবং আবার ফিরে আসে আব্বাস প্রসঙ্গে। ক্যাসেট চালু করে মাহজাবিন।

কাশমতি বলে, আব্বাসের মায়ের প্রসবব্যথা ওঠে বিকেলের দিকে। কাশমতিকে ডাকা হয়। কাশমতি এবারও শাস্ত্রবিচার করে বলে দেয় যে বাচ্চা হবে মাঝরাতে। ‘কেমন শাস্ত্রবিচার?’ জানতে চাওয়া হয় তার কাছে। কাশমতি ব্যাখ্যা করে। শাস্ত্রমতে মায়ের একগোছা চুল তার মুখের ওপর নাক বরাবর ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সেই চুলের ওপর ঢেলে দেওয়া হয় কয়েক ফোঁটা তেল। সেই তেল চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে মায়ের স্ফীত পেটের ওপর। তেল যদি ঠিক নাভি বরাবর পড়ে বাচ্চা হবে যখন–তখন। বাঁ পাশে পড়লে বাচ্চা হতে ঘণ্টাখানেক আর ডানে পড়লে বাচ্চা হতে অনেক দেরি। আব্বাসের মায়ের তেল পড়েছিল ডান দিকে।

খানিক বিরতি দিয়ে ক্লারাকে তরজমা করে শোনায় মাহজাবিন। ক্লারা তরজমা শোনার ফাঁকে ফাঁকে নোট নেয়।

কাশমতি বলে, সে নিশ্চিত ছিল মাঝরাতের আগে পানি ভাঙবে না। সন্ধ্যার পর থেকে কাশমতি প্রস্তুতি নিতে থাকে। সে পোয়াতির ঘরে রেখে দেয় এক টুকরা ছেঁড়া জাল আর একখণ্ড পুরোনো লোহা, যা সে বরাবর করে থাকে। জালটি আব্বাসের মাকে রক্ষা করবে খারাপ আলগা বাতাস থেকে আর লোহা বাঁচাবে খারাপ জিনের হাত থেকে।

শেষরাতে আব্বাসের মায়ের পানি ভাঙে আর তার পর থেকেই শুরু হয় একটার পর একটা বিপদ। জরায়ুপথে বাচ্চার মাথাটা যখন শুধু বেরিয়ে এসেছে, কাশমতি দেখে বাচ্চার মাথায় কয়েক প্যাঁচে জড়িয়ে রয়েছে নাড়ি। অনেক কসরত করে দ্রুত গলা থেকে সেই নাড়ির প্যাঁচ ছাড়ায় কাশমতি। এ সময় বাচ্চা পুরোটা বেরিয়ে এলে সবাই দেখতে পায় ছেলে হয়েছে। সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। প্রশান্তি নেমে আসে আব্বাসের মায়ের মুখে। কিন্তু সে আনন্দ স্থায়ী হয় না বেশিক্ষণ। কারণ, বাচ্চা কাঁদে না। মাথা নিচে পা উপুড় করে পিঠে চাপড় দেয় কাশমতি। কিন্তু তবু বাচ্চা কাঁদে না। বিপদ আরও দেখা দেয়। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে তবু জরায়ু থেকে গর্ভফুল বেরিয়ে আসছে না। খানিকটা শঙ্কিত হয়ে পড়ে কাশমতি। দ্রুত দুটো ব্যবস্থা নেয় সে। প্রথমত, বাইরে গিয়ে বিড়ি ফুঁকতে থাকা উদ্বিগ্ন আব্বাসের বাবাকে বলে তাড়াতাড়ি বারকয়েক পরনের লুঙ্গিটি উল্টিয়ে পরতে। শাস্ত্রমতে স্বামী এ রকম করলে তার জাদুপ্রভাবে স্ত্রীর জরায়ুতে আটকে থাকা গর্ভফুল দ্রুত উল্টে বেরিয়ে আসে। দ্বিতীয়ত, সে একজনকে একটি কাঁসার থালা এনে সজোরে বাচ্চার কানের কাছে বাজাতে বলে। আব্বাসের বাবা কাশমতির নির্দেশমতো পরনের লুঙ্গিটি বারকয়েক উল্টিয়ে পরে এবং একজন মহিলা তুমুল শব্দে বাচ্চার কানের কাছে বাজাতে থাকে কাঁসার একটি বাটি। কিছুক্ষণের মধ্যে ধীরে আব্বাসের মায়ের গর্ভফুল বেরিয়ে আসে। কিন্তু না, বাচ্চা তবু কাঁদে না। মহিলাটি বিকট শব্দে কাঁসার থালা বাজাতে থাকে। একটা ভীতি ঘিরে থাকে সবাইকে। খড়ের ওপর তখন নিথর পড়ে আছে শিশুটি। দ্রুত সময় পেরোচ্ছে, কিছু একটা করতে হবে শিগগিরই। কাশমতি এবার অতিদ্রুত তার পরবর্তী শাস্ত্র প্রয়োগ করে। একটা কড়াই আনা হয়। পোয়াতির ঘরের চুলায় সেই কড়াই গরম করে সে। সেই গরম কড়াইয়ে কাশমতি বেওয়া এবার ভাজতে শুরু করে জরায়ু থেকে সদ্য বেরিয়ে আসা রক্তে জবুথবু গর্ভফুল। গর্ভফুলের অপর প্রান্তে নাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে নিষ্পাপ শিশু আব্বাস। কড়াইয়ে ফুল ভাজতে ভাজতেই এক পর্যায়ে নড়ে ওঠে শিশু। কেঁদে ওঠে তীব্র শব্দে। সবার স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে। কাশমতি এবার আব্বাসের নাড়ি কাটে গরম পানিতে ধুয়ে নেওয়া মাছ কাটা বঁটি দিয়ে। আর সে জন্যই তো, শুধু গতকালের বাউথ বলেই নয়, সব বাউথেই এখন সবচেয়ে বেশি মাছ ওঠে আব্বাসের জালে।

থামে কাশমতি বেওয়া। তার বিবরণের অনুবাদ পর্ব চলে।

‘মায়ের কোলে নেওনের আগে পচা রক্তের ভিতর থিকা পোলাটারে কোলে নিলাম আমি। আল্লাহর রহমত আর আমার উসিলা, কত বিপদের থিকা পোলাটারে বাঁচাইয়া তুইলা দিলাম মায়ের হাতে। হেই পোলায় অখন খ্যাত নিড়ায়।’

দূরে খেতের মাটিতে মগ্ন আব্বাসকে দেখে ভাবে কাশমতি বেওয়া। তার মনে একটা প্রশান্তি। এদের সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগছে তার। মনটা হালকা হচ্ছে। তার ধাত্রীজীবনের সুখ-দুঃখের কথা কেউ তো এত বিস্তারিতভাবে শুনতে চায়নি কখনো। কাশমতি ভাবে, হোক শহুরে, হোক বিদেশি, তবু মেয়েমানুষ তো, বুঝি তাই এসব নিয়ে ওদের এতটা কৌতূহল।

ওদিকে ক্লারা লিন্ডেন ভাবে ওয়ান্ডারফুল! দারুণ এক্সোটিক সব ডেটা পাওয়া যাচ্ছে। আমার থিসিসটা হবে দুর্দান্ত। হায় আব্বাস, গণনা, গীত, বাজনা, আগুন মিলিয়ে তোমার জন্মটা কালারফুল, অথচ তার পাশে সাদা অ্যাপ্রন, গ্লাভস, ফোরসেপ, টিভি মনিটর ঘেরা আমাদের জন্মদৃশ্যগুলো কতটা ম্লান!

আর মাহজাবিন খানের মনে তখন অন্য ভাবনা। ঠিক ভাবনা নয়, অস্বস্তি, বিস্ময়। এসব অদ্ভুত কাণ্ড! নিজের দেশের ভেতর এ কোন অচেনা সুদূর দেশ তার? কাকে অনুবাদ করবে সে? তার নিজেরই তো এখন প্রয়োজন একজন দোভাষীর। সে বিভ্রান্তি বোধ করে।

নিজকলমোহনায় তখন দুপুর। ঢেঁকিঘরে হাওয়া। সেখানে শ্বেতাঙ্গ, বাদামি, শ্যামবর্ণ তিনজন নারীর মিথস্ক্রিয়া।

Read full story at source