বিপদ এলে নবীরা যেভাবে আল্লাহকে ডাকতেন
· Prothom Alo

হঠাৎ চাকরি চলে গেছে। সংসার ভেঙে গেছে। শরীর ভীষণ অসুস্থ কিংবা ব্যবসায় বিরাট ধস। একটার পর একটা বিপদ এসে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে এখান থেকে উতরানোর পথ নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থা। কোথায় যাবেন বুঝতে পারছেন না।
Visit playerbros.org for more information.
এই মুহূর্তে কার সাহায্য নেবেন, আন্দাজ করতে পারছেন না। কাকে ডাকবেন জানেন না। বন্ধুদের সাহায্য চেয়েছেন, সবাই ফিরিয়ে দিয়েছে। নিজে চেষ্টা করেছেন, কাজ হয়নি। এখন শুধু একটাই অনুভূতি—জীবন নামক এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দাও মাবুদ!
এই মুহূর্তে একটু থামুন। কোরআন খুলুন। নবীরাও এমন বিপদের সম্মুখীন হতেন; কিছু ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় বিপদের। তাঁদের মনেও কখনো-সখনো হতাশা কাজ করত। কিন্তু তাঁরা জানতেন, বিপদ যত বড়ই হোক, ওপরে আল্লাহ আছেন। তিনিই সাহায্য করবেন।
সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩আর আইয়ুবকে স্মরণ করো, যখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিল, আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে এবং তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন চরম সংকটে পড়ে, তখন প্রার্থনা এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলন তার মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। যাঁরা সংকটের সময় বিশ্বাসের আশ্রয় নেন, তাঁদের মানসিক পুনরুদ্ধারের গতি অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। (Koenig, H. G. et al., 2012, Handbook of Religion and Health, Oxford University Press, নিউইয়র্ক)
কোরআনের নির্দেশনা
নবীদের জীবনের বিভিন্ন সময়ের দোয়াগুলো পড়লে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়, তাঁরা প্রত্যেকেই তিনটি করে কাজ করতেন।
এক. আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফেরা।
দুই. নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে নেওয়া।
তিন. আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখা। এই তিনটি কাজই সেই মূলমন্ত্র, যা প্রতিটি বিপদে উত্তরণের পথ খুলে দেয়।
কোরআনের শিক্ষা
১. তিন স্তরের অন্ধকারের মধ্যে নবী ইউনুসের দোয়া করেছেন, কোরআনে যা আল্লাহ নিজেই বর্ণনা করেছেন, ‘তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তুমি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭)
এই দোয়াটা কোন অবস্থায় পড়া হয়েছিল জানেন? সমুদ্রের অন্ধকার, রাতের অন্ধকার, মাছের পেটের অন্ধকারে। এই তিন স্তরের অন্ধকারে ডুবে ছিলেন ইউনুস (আ.)। মানবিক দৃষ্টিতে যেখান থেকে বের হওয়া একেবারে অসম্ভব।
কিন্তু এই দোয়ার এক গভীর মাহাত্ম্য আছে।
‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা’ মানে তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। এটা তাওহিদের স্বীকৃতি। মাছের পেটেও তিনি ভুলে যাননি ক্ষমতার মালিক কে। ‘সুবহানাকা’ মানে তুমি পবিত্র। বিপদের মধ্যেও তিনি অভিযোগ করেননি, আল্লাহর প্রশংসা করেছেন। ‘ইন্নি কুনতু মিনাজ জলিমিন’ মানে আমি নিজের ওপর জুলুমকারী ছিলাম।
কী দারুণ আত্মসমর্পণ! কোনো অজুহাত নেই, নিজের ভুল স্বীকার।
আল্লাহ তারপর বলেন, ‘তখন আমি তার দোয়া কবুল করলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৮)
আমরাও এভাবে বলতে পারি। সাজিয়ে গুছিয়ে কৃত্রিম কথা না বলে শুধু বলুন, হে আল্লাহ, আমি অনেক কষ্টে আছি। তুমি ছাড়া আমাকে দেখার কেউ নেই।
এটা শুধু ইউনুস (আ.)-এর গল্প নয়। আপনি মুমিন হলে এই প্রতিশ্রুতি রয়েছে আপনার জন্যও।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তি ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫০৫)
২. নবী আইয়ুবের দোয়ার কথা আল্লাহ কোরআনে উল্লেখ করেছেন, ‘আর আইয়ুবকে স্মরণ করো, যখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিল, আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে এবং তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩)
আইয়ুব (আ.) জীবনের একটি লম্বা সময় রোগে ভুগেছেন। কাছের আপন মানুষজন তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তবু তাঁর দোয়ায় কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো দীর্ঘ আরজি ছিল না।
‘শুধু এটুকু বলেছেন, ‘আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে’। এরপর বলেছেন, তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। অভিযোগের পরিবর্তে প্রশংসা। হতাশার বিপরীতে ভরসা।
এই সরল কথাটুকুই ছিল তাঁর দোয়া। আমরাও এভাবে বলতে পারি। সাজিয়ে গুছিয়ে কৃত্রিম কথা না বলে শুধু বলুন, হে আল্লাহ, আমি অনেক কষ্টে আছি। তুমি ছাড়া আমাকে দেখার কেউ নেই।
আল্লাহকে যেভাবে ডাকলে তিনি সাড়া দেন৩. নবী মুসার দোয়া। মুসা (আ.) তখন ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বাঁচতে মিসর ছেড়ে অচেনা কোনো শহরের পথে একাকী, নিঃস্ব অবস্থায় ঘুরছেন। সামনে কী হবে জানেন না।
তখন তিনি আল্লাহকে স্মরণ করলেন, “হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৪)
এখানে ‘ফাক্বির' বলা হয়েছে কোরআনে। মানে গরিব নয়, মুখাপেক্ষী, নির্ভরশীল। মুসা (আ.) মন থেকে আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করেছেন। এই দোয়ার পরই আল্লাহ তাঁর জীবন বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর সব সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন।
৪. নবী জাকারিয়ার দোয়ার কথা কোরআনে আল্লাহ বলেছেন। জাকারিয়া (আ.) যখন বৃদ্ধ বয়সে নিঃসন্তান। স্ত্রী বন্ধ্যা। মানবিক দৃষ্টিতে সন্তানলাভের কোনো সম্ভাবনা নেই।
তখন তিনি আল্লাহকে ডাকলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে একা রেখো না এবং তুমিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯)
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ এলে শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। বিপদ এলে সবর করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর।এই দোয়ায় কোনো জোরাজুরি নেই, সন্তান দিতেই হবে সেই শর্ত নেই। শুধু একটি আকুতি, ‘তুমিই সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী’। সন্তান না পেলেও–বা কী, তুমি তো আছ। এই আকুতির জবাবে আল্লাহ–তাআলা সন্তান হিসেবে নবী ইয়াহইয়াকে উপহার দিয়েছিলেন। আল্লাহর কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
৫. বিপদে আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ সুরা বাকারায় বলেন, ‘হে মুমিনগণ, ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
এখানে ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই দুটি পথেই আল্লাহর সাহায্য আসে—প্রথমে ধৈর্য ও এরপর সমাধানের জন্য নামাজ আদায়। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন, তাদের ছেড়ে যান না।
নবীদের দোয়াগুলো পাশাপাশি রাখলে একটা মিল চোখে পড়ে। তাঁরা কেউ দীর্ঘ আরজি করেননি। নিজের যোগ্যতা, শর্ত উল্লেখ করে আল্লাহকে সাহায্য করতে জোরজবরদস্তি করেননি। কেউ বলেননি আমি এত ভালো মানুষ, তাই আমাকে সাহায্য করো।
তাঁরা শুধু নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন এবং আল্লাহর প্রতি নিজেদের নির্ভরশীলতাকে স্বীকার করেছেন। নিজেকে সঁপে দিয়ে অপেক্ষা করেছেন আল্লাহর সাহায্যের।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ এলে শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। বিপদ এলে সবর করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর। এই বৈশিষ্ট্য শুধু মুমিনের জন্যই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
যদি এই মুহূর্তে আপনার জীবনে বিপদ থেকে থাকে, তবে অবিলম্বে একটা কাজ করুন। ওজু করুন। দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এরপর হাত তুলুন। এই মুহূর্তে আপনার মনে যা আছে, সেটাই বলুন। গোছানো কথার প্রয়োজন নেই।
সরল মনে অকপটে আল্লাহর কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করুন। নিজের প্রয়োজন তুলে ধরুন। দেখবেন, আল্লাহ যেভাবে সব নবীর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন, সেভাবে তিনি আপনার ডাকেও সাড়া দেবেন।
মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর : খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়