বঙ্গভবন থেকে তাঁদের নীরবে-নিভৃতে বিদায়

· Prothom Alo

সময়ের আগেই বঙ্গভবন ছাড়তে যাচ্ছেন মো. সাহাবুদ্দিন। রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব থেকে তাঁর এই বিদায় অনেকটাই রংহীন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী রাষ্ট্রপতি। স্বাধীন বাংলাদেশ সাহাবুদ্দিনসহ ১৭ জন রাষ্ট্রপতি দেখেছে। এর মধ্যে দুজন রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বাকিদের কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করেন স্বল্প সময়ের জন্য, ছিলেন অস্থায়ীও। মেয়াদ শেষের আগেই পদ ছাড়তে হয়েছে অধিকাংশকে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির বিদায়ের জন্য সংবিধান বা আইনে বাধ্যতামূলক কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় আচার বা অনুষ্ঠান নেই। তবে ২০১৩ সালে মো. আবদুল হামিদকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হয়। তখন বঙ্গভবন থেকে বলা হয়েছিল, এই ধরনের বিদায় অনুষ্ঠান স্বাধীন বাংলাদেশে সেটাই প্রথম।

আবদুল হামিদকে সে সময় বঙ্গভবনে বিদায়ী গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। লালগালিচা সংবর্ধনার পাশাপাশি পুষ্পশোভিত খোলা জিপে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে বিদায় জানানো হয় তাঁকে। খোলা জিপটি বঙ্গভবনের মূল ফটকে পৌঁছালে আবদুল হামিদ ও তাঁর স্ত্রী বিশেষ নিরাপত্তা দলের তত্ত্বাবধানে অন্য গাড়িতে করে নিকুঞ্জে নিজে বাড়িতে যান।

বাংলাদেশে যে কজন রাষ্ট্রপতি স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদেরও এভাবে সংবর্ধনার মাধ্যমে বিদায় হয়নি। এর একটা কারণ হতে পারে, রাষ্ট্রপতি পদে তাঁরা নিজ দলের শাসনামলে নির্বাচিত হলেও বিদায় হয়েছে প্রতিপক্ষ দলের শাসনামলে।

অর্থাৎ ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে। প্রতিবারই বিরোধী দল সরকার গঠন করেছে। অর্থাৎ সরকারি দল নির্বাচনে হেরে বিরোধী দলের আসনে বসেছে। ফলে প্রতিপক্ষ দলের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির বিদায় স্মরণীয় করার চেষ্টা করা হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান দুজনই রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন

আওয়ামী লীগ ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি নির্বাচন হয় শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় রেখে। নির্বাচনের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায় আওয়ামী লীগ জিতবে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হবেন। সেই আমলের প্রতিটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে তিনজন রাষ্ট্রপতি পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রথমজন জিল্লুর রহমান ২০১৩ সালে মারা যান। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ। এরপর তিনি পরপর দুইবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সংবিধানে দুইবারের বেশি কারও রাষ্ট্রপতি হওয়ার সুযোগ নেই।

২০২৩ সালে অনেকটা আকস্মিকভাবে রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর সময়কালেই ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ, তাদের সহযোগী দল এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচন হয়, যা ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়।

ওই বছর ৫ আগস্ট ছাত্র গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এরপরই অনেকটা ঠিক হয়ে যায় যে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ হয়তো শেষ করতে পারবেন না। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পরই সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার ক্ষণগণনা শুরু হয়। গত শুক্রবার তা বাস্তবায়ন হয়।

শুরুর দিকে সংকট, হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অবশ্য তাঁর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। দুদিন পর ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

তিনি ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান তৎকালীন স্পিকার মোহাম্মদউল্লাহ। ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠা করলে পরদিন থেকে পুনরায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই বছরের ১৫ আগস্ট একদল সেনাসদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যা করেন।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে একমাত্র মো. আবদুল হামিদই দুই মেয়াদ পূর্ণ করেন, তাঁর বিদায়ও হয়েছিল ঘটা করে

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। অবশ্য এর মধ্যে ক্যু, পাল্টা ক্যু চলতে থাকে। তিন মাসের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন মোশতাক। তিনি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৭৮ সালের জুনে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন জিয়া। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

এর মধ্যে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ। ১৯৮২ সালে এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। টানা ৯ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন এরশাদ।

গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগের পর সবার চোখ এখন বঙ্গভবনের দিকে

বিদায়টা প্রতিপক্ষ দলের সময়

১৯৯১ সালে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনরায় চালু হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির পদ অনেকটা আলংকারিক হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি হন বিএনপির আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি তাঁর পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেন, তবে বিদায় সংবর্ধনা পাননি। তাঁর বিদায়ের আগে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসে, তখন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ আবার রাষ্ট্রপতি হন। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ ছিল, তাঁদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ নির্বাচনের সময় ‘যথাযথ’ ভূমিকা রাখেননি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের বিদায় হয়েছে অনেকটা নীরবে–নিভৃতে।

এরশাদ সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর অনুরোধে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছিলেন এবং সেই সরকারের অধীন সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হয়েছিল। সাহাবুদ্দীন আহমদকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করা হয়।

এক সংকটকালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে হয়েছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে। তাঁকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শ্রদ্ধার সঙ্গেই স্মরণ করা হয়

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল দলীয় নেতা এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। তবে মাত্র সাত মাস সাত দিন পরই তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়। দলের সঙ্গে মতবিরোধে তাঁকে পদত্যাগের অনুরোধ করা হয়েছিল।

বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে তৎকালীন স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি সরকার ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর খালেদা জিয়ার সরকারের মেয়াদ শেষ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, এই নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন।

তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দল আন্দোলন শুরু করে। একপর্যায়ে এক-এগারোর পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি পদে ইয়াজউদ্দিনই থেকে যান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন।

Read full story at source