মেসিদের কাছে হেরেও জিতে গেল কেপ ভার্দে

· Prothom Alo

লেখাটা কোথা থেকে শুরু করা যায়? আজ ১২০ মিনিট ধরে চলা মহাকাব্যিক ম্যাচটি নিয়ে কথা যেখান থেকেই শুরু করি না কেন, একটা নামই উঠে আসবে—কেপ ভার্দে।

Visit moryak.biz for more information.

ম্যাচের আগে যে দলটি তান্ত্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়া কোথাও জেতেনি, তারা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার হৃৎস্পন্দন প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল!

ম্যাচের এক পর্যায়ে অনেকে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ দলের নাম বুঝি ভুলে গিয়েছিলেন! কেপ ভার্দের খেলা দেখে যে মনেই হয়নি, এই দল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে, আর্জেন্টিনার চেয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে ৬৩ ধাপ। কখনো কখনো এই ম্যাচ গত বিশ্বকাপে ফ্রান্স-আর্জেন্টিনার রুদ্ধশ্বাস ফাইনালের কথাও যেন মনে করিয়ে দিল। লুসাইলের সেই উত্তেজনা ও আবেগ ভর করেছিল মায়ামিতেও।

তবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে, রেকর্ড গড়া লিওনেল মেসিকেও ছায়ায় ঢেকে দিতে পেরেছে কেপ ভার্দে। এমন ম্যাচ নিয়েই তাই ‘ফুটবল ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’তে উরুগুয়ের বিখ্যাত লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো লিখেছিলেন, ‘যখন সুন্দর ফুটবল হয়, আমি সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই। সে খেলা কোন দল বা দেশ খেলল, তা আমি ভাবিই না।’

এটি ছিল আক্ষরিক অর্থে ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই। শক্তিশালী গোলিয়াথ আর্জেন্টিনা, ডেভিড যেন ছোট্ট দেশ কেপ ভার্দে।। কিন্তু ফুটবল মাঠের সবুজ জমিনটুকু সবার জন্যই সমান। নিজেদের দিনে যারা ভালো খেলে, মাঠ তাদের হয়েই কথা বলে। মায়ামি স্টেডিয়ামের জন্য অবশ্য এই ম্যাচের মীমাংসা সহজ ছিল না। ঘরের ছেলে লিওনেল মেসির দলের জয়ে সে হেসেছে বটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুকে টেনে নিয়েছে কেপ ভার্দেকেও। এমন ‘শত্রু’কে কোনো কিছু না ভেবেই যে ভালোবাসা যায়!

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে কেপ ভার্দে। তাদের দ্বিতীয় গোলের পর

কেপ ভার্দের জন্য এই ম্যাচে হারানোর কিছু ছিল না। পাওয়ার ছিল অনেক কিছু। জয়, ভালোবাসা, সম্মান, মর্যাদা, সমীহসহ কত কিছু! একমাত্র জয়টা ছাড়া বাকি সব কিছু কুড়িয়ে নিয়েছে তারা। এই ম্যাচে পরাক্রমশালী আর্জেন্টিনাকে চ্যালেঞ্জ দিতে নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে পারফর্ম করতে হতো দলটিকে। তারা করেছেও তা–ই। মাঠে পুরো সময়টাতে নিজেদের উজাড় দিয়েছে। রক্ষণ থেকে আক্রমণে একসঙ্গে উঠেছে আবার একসঙ্গে নেমেছে। যখন যা করা প্রয়োজন ছিল, তা–ই করেছে।

স্পেনের বিপক্ষে অতিমানবীয় পারফর্ম করা গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এই ম্যাচেও ছিলেন অনন্য। ওয়ান টু ওয়ানে মেসিকে একাধিকবার হতভম্ব করে ছেড়েছেন। ফ্রি-কিক থেকেও ঠেকিয়েছেন মেসির একাধিক শট।

ভোজিনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে মেসি ১টি গোল পেলেও বাকি সময়টাতে অবাক হয়ে শুধু ভোজিনিয়ার গোল ঠেকানোর জাদুই যেন দেখে গেলেন। ৪০ বছর বয়সী ভোজিনিয়া ফুটবল ইতিহাসের মহামানব মেসিকে আজ যে হতাশা উপহার দিয়েছেন, তা মেসি অনেক দিন মনে রাখবেন। সবাই যখন মেসিকে মানুষ ভাবতেই ভুলে গিয়েছিল, তখন কদিন আগপর্যন্তও ‘অখ্যাত’ এই গোলরক্ষক যেন বুঝিয়ে দিলেন, মেসিও রক্ত-মাংসের একজন।

ভোজিনিয়া। কেপ ভার্দের এই গোলকিপারকে মনে রাখবে ২০২৬ বিশ্বকাপ

সব মিলিয়ে ভোজিনিয়া এই ম্যাচে সেভ করেছেন ৮টি। কোনো কোনো সেভে ভোজিনিয়া এমনভাবে বলের সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, তা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল লিভারপুল কিংবদন্তি বিল শ্যাঙ্কলির সেই অমর কথাটি, ‘কেউ কেউ বলে ফুটবল নাকি জীবন–মরণ সমস্যা। আমার মনে হয় তারা ভুল বলে। এটি জীবন-মরণের চেয়েও বেশি কিছু।’

শেষ ষোলোয় ওঠার আগে কেপ ভার্দেতে কাঁপল আর্জেন্টিনা

এই ম্যাচের আরও একটি দৃশ্য ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো। ১০৩ মিনিটে করা সিডনি কাবরালের করা অনিন্দ্যসুন্দর গোলটি। বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে কাবরাল ভেতরের দিকে কাট করেন। এরপর ডান পায়ে নেন দুর্দান্ত এক বাঁকানো শট, বল গিয়ে জড়ায় দূরের ওপরের পোস্টে। তাঁর শট যেভাবে দূরের পোস্ট কাঁপিয়েছে, সেই কম্পন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ হয়তো আরও অনেক দিন টের পাবেন। গোলের পর গ্যালারিতে গিয়ে কাছের মানুষকে খুঁজে নিয়ে কাবরালের করা উদ্‌যাপনও ছিল মনে রাখার মতো।

দিন শেষে কেপ ভার্দে ম্যাচটা হেরে বিদায় নিল। কিন্তু বিশ্বকাপে পরাশক্তিদের ‘কেপ-ফিয়ার’ সিনেমার মতো যে রোমাঞ্চ উপহার দিয়েছে, তা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।

এই দল কখনো হার মানে না, বললেন স্কালোনি

Read full story at source