সমকালীন গণমাধ্যমের নীতি গঠনে ইসলামের প্রস্তাবনা
· Prothom Alo

তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় যাত্রা বিশ্বকে একটি বৈশ্বিক গ্রামে (গ্লোবাল ভিলেজ) রূপান্তর করেছে—এ কথা বহুল প্রচলিত। তবে এই রূপান্তরের নেপথ্য কারিগর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোটি মোটেও সমতাভিত্তিক নয়।
সমকালীন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর আধেয় ও নীতি নির্ধারণী দর্শন প্রায় সম্পূর্ণভাবে করপোরেট স্বার্থ ও ভোগবাদী দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
Visit extonnews.click for more information.
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হলো, এখানে নৈতিক চেতনার চেয়ে বস্তুগত লাভ এবং পরকালীন জবাবদিহিতার চেয়ে ইহকালীন সস্তা কাটতিকে (রেটিং) পরম জ্ঞান করা হয়।
ফলে বিশ্বজুড়ে ধর্মবিরোধী প্রচারণা এবং সত্যনিষ্ঠ বয়ানকে সুপরিকল্পিতভাবে সেন্সর করার যে প্রবণতা আমরা দেখছি, তা মোকাবিলায় মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের নতুন কৌশল ও প্রচার-আদর্শ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
যেহেতু গণমাধ্যম সীমিত পরিসরে সমাজের সব ঘটনা তুলে ধরতে পারে না, তাই কোন খবরটি কতটা জরুরি, তা নির্ধারণে শরিয়তের এই উদ্দেশ্যভিত্তিক নীতি বড় আলোকবর্তিকা হতে পারে।
এজেন্ডা সেটিং বনাম অগ্রাধিকার ‘ফিকহ’
আধুনিক গণমাধ্যম বিজ্ঞানের একটি প্রভাবশালী তত্ত্ব হলো অগ্রাধিকার বিন্যাস (এজেন্ডা সেটিং)। ১৯২২ সালে ওয়াল্টার লিপম্যান তাঁর পাবলিক ওপিনিয়ন গ্রন্থে এই ধারণার অবতারণা করেন।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী আরমান মাতলার দেখিয়েছেন, মিডিয়া সমাজকে এটা শেখায় না যে মানুষ ‘কী ভাববে’, বরং চতুরতার সঙ্গে এটা নির্ধারণ করে দেয় যে মানুষ ‘কোন কোন বিষয়ে ভাববে।’ (আরমান মাতলার, মিডিয়া অ্যান্ড কালচার, পৃষ্ঠা ৪৫, প্যারিস, ১৯৯৮)
জনমানুষের চিন্তার এই ‘এজলাস’ তৈরি করার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মিডিয়া প্রায়ই নৈতিক মানদণ্ডের চেয়ে পুঁজির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়।
ঠিক এই সংকটে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দেয় ইসলামের অগ্রাধিকারের বিধি, ইসলামি পরিভাষায় যাকে বলে ‘ফিকহুল আওলাবিয়্যাত’।
ইউসুফ কারাজাভি এর সংজ্ঞায় লিখেছেন, এটি হলো ওহি ও আকলের আলোকে প্রতিটি বিষয় ও মূল্যবোধকে তার গুরুত্ব অনুযায়ী বিন্যাস করা; অর্থাৎ যা আগে আসার উপযুক্ত তাকে আগে রাখা। (ড. ইউসুফ আল-কারাজাভি, ফিকহু আওলাবিয়্যাতিল হারাকাতিল ইসলামিয়্যাহ ফিল মারহালাতিল ক্বাদিমা, ১/১২, দারুশ শুরূক, কায়রো, ২০০৬)
গণমাধ্যমের ভাষায় একে আমরা ‘মিডিয়া বয়ানের অগ্রাধিকার’ বলতে পারি। যেহেতু গণমাধ্যম সীমিত পরিসরে সমাজের সব ঘটনা তুলে ধরতে পারে না, তাই কোন খবরটি কতটা জরুরি, তা নির্ধারণে শরিয়তের এই উদ্দেশ্যভিত্তিক নীতি বড় আলোকবর্তিকা হতে পারে।
পেশাগত জীবনে দুর্নীতি মুক্ত থাকতে ইসলামের ১০ নির্দেশনাকোরআনে শব্দ ব্যবহারের নির্দেশনা
ইসলামি চিন্তাধারায় গণমাধ্যমের ভাষা ও ভঙ্গি কেমন হবে, তার সুনিপুণ রূপরেখা কোরআনে অঙ্কিত রয়েছে। বক্তব্য কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে আল্লাহ বলছেন, ‘আমার বান্দাদের বলো, তারা যেন এমন কথা বলে যা অতি উত্তম।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৫৩)
আল্লামা ইবনে বাদিস এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর অর্থ হলো সাধারণ সংলাপ থেকে শুরু করে মিডিয়ার সম্পাদকীয়—সব ক্ষেত্রে সাবলীল ও মার্জিত শব্দ চয়ন করা, যাতে সমাজে কোনো ফিতনা তৈরি না হয়। (আল্লামা ইবনে বাদিস, তাফসিরু ইবনি বাদিস, ১/৩১০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৯৫)
মক্কি যুগে যখন ইসলাম প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন প্রচারণার প্রধান অগ্রাধিকার ছিল বিশ্বাসের বুনিয়াদ গঠন; সেখানে ফিকহি খুঁটিনাটি বা জটিল সমাজ সংস্কারের দাবিগুলো ছিল না।
আজকের ‘প্রোপাগান্ডা’র যুগে শব্দ ও পরিভাষা জনমানসে কীরূপ প্রভাব ফেলে, তা সুরা বাকারার ১০৪ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে অনুধাবন করা যায়। মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা রাঈনা (আমাদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন) বলো না, বরং উনজুরনা (আমাদের প্রতি দৃষ্টি দিন) বলো।’
ইহুদিরা ‘রাঈনা’ শব্দটিকে একটি নেতিবাচক দ্ব্যর্থবোধক অর্থে ব্যবহার করত দেখে আল্লাহ বিকল্প সুন্দর শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেন। ইমাম সমরকন্দি একে শব্দ চয়নের শুদ্ধতা ও নিজস্ব পরিভাষা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (ইমাম আবু লাইস সমরকন্দি, বাহরুল উলুম, ১/৯৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)
নবীজির কৌশল
মহানবী (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রচার কৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা তৎকালীন যুগের গণমাধ্যমগুলো (যেমন কবিতা বা কূটনৈতিক চিঠি) অত্যন্ত কৌশলী ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যবহার করেছিলেন।
মক্কি যুগে যখন ইসলাম প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন প্রচারণার প্রধান অগ্রাধিকার ছিল বিশ্বাসের বুনিয়াদ গঠন; সেখানে ফিকহি খুঁটিনাটি বা জটিল সমাজ সংস্কারের দাবিগুলো তেমন ছিল না।
কাফেরদের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের জবাবে মহানবী (সা.) সাহাবি হাসসান ইবনে সাবিতকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি ওদের বিরুদ্ধে কবিতা বলো, জিবরাইল তোমার সঙ্গে আছেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২১২)
ইসলামের ‘জুহ্দ’ নাকি আধুনিক ‘মিনিমালিজম’: কোনটা বেশি সুন্দরওসামা আশকার দেখিয়েছেন, নবীজির এই মিডিয়া ক্যাম্পেইনে কাদা ছোড়াছুড়ির বদলে যৌক্তিক জবাব এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে সহজ ও ছন্দময় ভাষার ব্যবহার অগ্রাধিকার পেত। (ড. ওসামা আল-আশকার, আল-ইদাহ আল-ইলামিয়্যাহ লিন-নাবি, পৃষ্ঠা ৮৮, দারুন নাফায়িস, বৈরুত, ২০০৭)
‘মাকাসিদ’–এর আলোকে সংবাদ বিন্যাস
শরিয়তের উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদ’ মূলত পাঁচটি স্তম্ভকে রক্ষা করে: ধর্ম, জীবন, বুদ্ধি, বংশধারা ও সম্পদ। ইমাম গাজালি একে শরিয়তের রূহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালি, আল-মুসতাসফা, ১/১৭৪, বৈরুত, ১৯৯৭)
এই পঞ্চ-মাকাসিদের আলোকেই সমকালীন গণমাধ্যমের কনটেন্টকে অপরিহার্য (জরুরিয়াত), প্রয়োজনীয় (হাজিয়াত) এবং সৌন্দর্যবর্ধক (তাহসিনিয়াত)—এই তিন স্তরে বিন্যাস করা সময়ের দাবি।
আজকের অনেক ধর্মীয় ভাবধারার মিডিয়াও ভেতরের মূল কনটেন্ট মানুষের অধিকার বা নিপীড়নের বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলার মতো বিষয়কে দুর্বল রেখে বাইরের চাকচিক্য বা রেটিং বাড়ানোর পেছনে সব শক্তি ব্যয় করে।
আজকের অনেক ধর্মীয় ভাবধারার মিডিয়াও ভেতরের মূল কনটেন্ট মানুষের অধিকার বা নিপীড়নের বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলার মতো বিষয়কে দুর্বল রেখে বাইরের চাকচিক্য বা রেটিং বাড়ানোর পেছনে সব শক্তি ব্যয় করে। কিন্তু অগ্রাধিকার ফিকহের মূল কথা হলো, অপরিহার্য বিষয়কে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে বাহ্যিক অলঙ্করণে লিপ্ত হওয়া হেকমতের পরিপন্থী।
সমাজে গুজব ও অপতথ্য (মিনইনফরমেশন) প্রতিরোধ করা হলো অপরিহার্য বা ‘জরুরিয়াত’ স্তরের কাজ।
সারকথা
সমকালীন গণমাধ্যম শুধু তথ্য সরবরাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি জনমত গঠন ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার। মুসলিম বিশ্বের গণমাধ্যমকে যদি আস্থা ধরে রাখতে হয়, তবে যৌক্তিক ও স্বচ্ছ এজেন্ডা তৈরি করতে হবে।
সস্তা নিউজের পেছনে না ছুটে উম্মাহর দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার তালিকায় শীর্ষে রাখলেই গণমাধ্যম তার আসল উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারবে।
ইসলামের আলোকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ১০ নীতি